হিমালয়ে পাকিস্তান-চীনের যৌথ সীমান্ত কমিশন, তীব্র আপত্তি ভারতের
এই পুরনো বিরোধেই যেন নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান ও চীন হিমালয়ের বিতর্কিত একটি অঞ্চলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যৌথ সীমান্ত কমিশন গঠনের চুক্তি করেছে। আর এই ঘোষণাতেই তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ভারত।
দিল্লির মূল প্রশ্ন—যে ভূখণ্ডকে ভারত নিজেদের বলে দাবি করে, সেই এলাকায় পাকিস্তান ও চীন কীভাবে নিজেদের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারে?
বিরোধের সূত্রপাত ১৯৬৩ সালের চুক্তিতে
এই ঘটনাটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ছয় দশকেরও বেশি সময় আগে, ১৯৬৩ সালে।
সে সময় পাকিস্তান ও চীন একটি সীমান্ত চুক্তি করে। ওই চুক্তির আওতায় পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলের শাকসগাম উপত্যকায় প্রায় ৫,১৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা চীনের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হয়।
পাকিস্তান এই চুক্তিকে বৈধ সীমান্ত সমঝোতা হিসেবে দেখে। তবে ভারত শুরু থেকেই এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
ভারতের বক্তব্য, পুরো অঞ্চলটি সাবেক জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ ছিল। তাই পাকিস্তানের ওই ভূখণ্ড চীনের কাছে হস্তান্তর করার কোনো আইনগত অধিকার ছিল না।
এখানেই বিরোধের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তৈরি হয়।
পাকিস্তানের দৃষ্টিতে জম্মু ও কাশ্মীর একটি অমীমাংসিত বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। ফলে ১৯৬৩ সালের চুক্তি নিয়ে ভারতের আপত্তিকে ইসলামাবাদ গ্রহণ করে না।
অন্যদিকে দিল্লির অবস্থান হলো, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা ওই ভূখণ্ডও ভারতের অংশ। ফলে পাকিস্তান ওই অঞ্চলের বিষয়ে চীনের সঙ্গে কোনো নতুন ব্যবস্থা নিলে ভারত সেটিকে শুধু পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখে না।
ভারতের দৃষ্টিতে এটি সরাসরি তাদের দাবিকৃত ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নতুন করে কেন যৌথ সীমান্ত কমিশন?
পুরনো ব্যবস্থার ওপর এবার নতুন করে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
পাকিস্তান ও চীন যৌথ সীমান্ত কমিশন গঠন সংক্রান্ত একটি চুক্তি করেছে। পাকিস্তানের ভাষায়, এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং যোগাযোগ সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
অর্থাৎ বিষয়টি শুধু মানচিত্রে একটি সীমারেখা টানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এর সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে মানুষের চলাচল, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার মতো বাস্তব বিষয়ও যুক্ত রয়েছে।
তবে দিল্লির প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভারতের তীব্র আপত্তি
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, ভারত পাকিস্তান ও চীনের তথাকথিত সীমান্ত কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করছে এবং এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
ভারতের যুক্তি হলো, যে ভূখণ্ডকে তারা অবৈধভাবে দখল করে রাখা ভারতীয় এলাকা বলে মনে করে, সেই ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তানের কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার নেই।
ফলে পাকিস্তান-চীন সীমান্ত নিয়ে নতুন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দিল্লির কাছে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
শাকসগাম উপত্যকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শাকসগাম উপত্যকা এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে।
দুর্গম কারাকোরাম পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত এই অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে কঠিন হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর আশপাশে রয়েছে কারাকোরাম পর্বতমালা, পাকিস্তান-চীন যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের বিস্তৃত অবকাঠামো।
কারাকোরাম মহাসড়ক চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে স্থল যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটি শুধু সামরিক বা আইনি বিষয় নয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত বাস্তবতাও যুক্ত।
CPEC-এর সঙ্গে সম্পর্ক
চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা CPEC।
পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর থেকে শুরু করে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের দিকে বিস্তৃত এই প্রকল্পকে বেইজিং তার বৃহত্তর বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে।
এই অবকাঠামোর নিরাপত্তা, সীমান্ত দিয়ে চলাচল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনও দুই দেশের সহযোগিতাকে প্রভাবিত করে।
ফলে যৌথ সীমান্ত কমিশনকে এই বৃহত্তর সম্পর্কের একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এত বছর পর বিষয়টি কেন সামনে এলো?
এখন প্রশ্ন হলো, ১৯৬৩ সালের চুক্তির বিষয়টি এত বছর পর নতুন করে কেন সামনে এলো?
দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, দিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাবিনটি জেকবের মতে, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিতেই যৌথ সীমান্ত কমিশনের কথা ছিল।
অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এত বছর পর কেন এই ব্যবস্থাকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হলো।
তার মতে, চীনের বৃহত্তর সীমান্ত নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা প্রচেষ্টা এবং পাকিস্তানের সীমান্ত পরিস্থিতির মধ্যে যোগাযোগ ও চলাচলকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার প্রয়োজন এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধও গুরুত্বপূর্ণ
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ও চীনের নিজেদের মধ্যেও হিমালয় সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। লাদাখ থেকে অরুণাচল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় দুই দেশের সীমান্ত দাবি পরস্পরের সঙ্গে মেলে না।
২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ সেই বিরোধকে আরও গুরুতর পর্যায়ে নিয়ে যায়।
এরপর বহু দফা সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশ সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার পথও খুঁজছে।
কিন্তু ভারতের দৃষ্টিতে এখন যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো—পশ্চিম সীমান্তের কাছাকাছি একই সময়ে চীন ও পাকিস্তানের সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক হচ্ছে।
অর্থাৎ পূর্ব ও উত্তর সীমান্তে চীনের সঙ্গে ভারতের যে বিরোধ রয়েছে, তার পাশাপাশি পশ্চিম দিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডেও চীন সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।
এটি কি নতুন সামরিক পদক্ষেপ?
দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে বিষয়টিকে সরাসরি নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার কারণ নেই।
কারণ যৌথ সীমান্ত কমিশনের আলোচনায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, চলাচল ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার মতো বিষয়ও রয়েছে।
তবে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বকে উপেক্ষা করা হচ্ছে না।
পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের রাজনৈতিক বার্তা
পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হোসেন হাক্কানীর মতে, নতুন কমিশন একই সঙ্গে বাস্তবধর্মী এবং রাজনৈতিক।
তার ব্যাখ্যায়, এটি সীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করা, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং CPEC-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো রক্ষার একটি প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে এর মধ্যে ভারতের প্রতি একটি রাজনৈতিক বার্তাও থাকতে পারে।
এই ব্যাখ্যার কেন্দ্রে রয়েছে কাশ্মীর।
চীন দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান দেখিয়েছে। অন্যদিকে ভারত চায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাশ্মীরকে তার অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
ফলে পাকিস্তান ও চীন যখন কাশ্মীর সংলগ্ন বিতর্কিত ভূখণ্ডে নিজেদের সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক করে, তখন সেটি দিল্লির কাছে কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে থাকে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় আন্তর্জাতিক কূটনীতি, মানচিত্র, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্ন।
শেষ কথা
হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে সীমান্তের রেখাগুলো হয়তো মানচিত্রে কয়েকটি দাগের মতো দেখায়, কিন্তু বাস্তবে সেই রেখার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু দশকের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিরোধ।
১৯৬৩ সালের পাকিস্তান-চীন সীমান্ত চুক্তি থেকে শুরু করে শাকসগাম উপত্যকা, কারাকোরাম, CPEC এবং ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ—সবগুলো বিষয়ই এই নতুন যৌথ সীমান্ত কমিশনের আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
পাকিস্তান ও চীনের কাছে এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, ভারতের কাছে বিষয়টি সরাসরি ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।
ফলে হিমালয়ের নীরব পাহাড়ে নতুন কোনো সংঘাতের শব্দ শোনা না গেলেও, মানচিত্র, সীমান্ত ও কূটনীতির স্তরে পুরনো বিরোধ নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
Pakistan China Border, Joint Border Commission, Shaksgam Valley, India Pakistan China, Kashmir Dispute, Himalaya Border Dispute, Sino Pakistan Border, CPEC, Karakoram, India China Border, 1963 Border Agreement, Shaksgam Valley Dispute

মতামত জানান: