ইরানের পরমাণু চুক্তি ছাড়ার উদ্যোগ, ১৩০ সংসদ সদস্যের স্বাক্ষরে বাড়ছে উত্তেজনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ZAPZAB

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তেহরান থেকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা সামনে এসেছে। একদিকে ইরানের সংসদে পরমাণু অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি (NPT) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দাবিতে ১৩০ জন সংসদ সদস্য স্বাক্ষর করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে তেহরান ছেড়েছেন।

একই দিনে ঘটে যাওয়া এই দুটি ঘটনা ইরানের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। সংসদে চুক্তি ছাড়ার উদ্যোগ এবং একই সময়ে আলোচনার পথে এগিয়ে যাওয়া, দুটো পদক্ষেপই পরিস্থিতির ভিন্ন দিক তুলে ধরছে।

ইরানের সংসদে ১৩০ সদস্যের যৌথ বিবৃতি

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর, রবিবার ইরানের সংসদে পরমাণু অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন সংসদ সদস্য হোসেন আলী হাজী দলিগানি।

তিনি দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের জন্য এই চুক্তিতে থাকার সুবিধা সীমিত হয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্যে ইরানের পরমাণু স্থাপনা ও দেশের ওপর পরিচালিত হামলার প্রসঙ্গ উঠে আসে।

এর পাশাপাশি, ইরানের ১৩০ জন সংসদ সদস্য সংসদের পরিচালনা পরিষদের কাছে একটি যৌথ বিবৃতি জমা দেন। সেখানে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব শুরু করার দাবি জানানো হয়েছে।

ইরানের সংসদে মোট ২৯০টি আসন রয়েছে। সেই হিসাবে ১৩০ জন সদস্যের স্বাক্ষর বিষয়টিকে সংসদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন হিসেবে তুলে ধরেছে।

এনপিটি চুক্তি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এনপিটি বা Nuclear Non-Proliferation Treaty হলো পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি।

এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  1. পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা।
  2. শান্তিপূর্ণ কাজে পরমাণু শক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা।
  3. আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা ও সহযোগিতা জোরদার করা।

প্রদত্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সংসদ সদস্যরা মনে করছেন, চুক্তিতে থাকার পরও দেশটির পরমাণু স্থাপনা নিরাপদ থাকেনি এবং চুক্তির প্রত্যাশিত সুবিধাগুলো পাওয়া যায়নি।

তাঁদের অভিযোগের মধ্যে পরিদর্শন ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক চাপ ও গুপ্তচরবৃত্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন জরুরি বিল: দ্রুত আলোচনায় তোলার উদ্যোগ

ইরানের সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাবটিকে তিন জরুরি বিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের সংসদীয় প্রক্রিয়ায় জরুরি বিলের মাধ্যমে সাধারণ আইন প্রণয়নের তুলনায় দ্রুত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তিন জরুরি বিলকে সর্বোচ্চ জরুরি স্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিলটি এখনো আইনে পরিণত হয়নি।

এটি সংসদের পরিচালনা পরিষদের বিবেচনাধীন এবং আলোচনায় তোলার জন্য স্পিকারের অনুমোদন প্রয়োজন বলে প্রদত্ত তথ্যে জানানো হয়েছে।

স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের ভূমিকা

ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।

প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়েছে, ইরানের অভ্যন্তরে কেউ যুদ্ধের পক্ষে অতিরিক্ত চাপ দিচ্ছে, আবার কেউ আত্মসমর্পণের কথা বলছে। তাঁর অবস্থান অনুযায়ী, এই দুই চরম অবস্থানের কোনোটিই সঠিক নয়।

একই সময়ে, সংসদে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিল আলোচনায় তোলার প্রক্রিয়ায় স্পিকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ফলে সংসদের উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রচেষ্টার মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

নিউইয়র্কের পথে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সংসদে চুক্তি ছাড়ার উদ্যোগের মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকাছি তেহরান ছেড়েছেন।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক। তবে তিনি সরাসরি সেখানে না গিয়ে কাতারের রাজধানী দোহায় যাত্রাবিরতি করেছেন।

ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দোহায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে পরামর্শ করা হবে।

দোহা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগ ও মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে কাতারের ভূমিকার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী:

  • ইরানের সাতটি শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কাতারের ভূমিকা ছিল।
  • কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা পুনরায় শুরু করার প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছেন।
  • দোহায় যাত্রাবিরতি আলোচনার আগে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে পরামর্শের সুযোগ তৈরি করছে।

এই তথ্যের ভিত্তিতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দোহা সফরকে কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

কেন এই সময়ে পরমাণু চুক্তি ছাড়ার উদ্যোগ?

প্রদত্ত প্রতিবেদনে ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিচালনা পরিষদের বৈঠকের কথা বলা হয়েছে।

সেখানে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর ইরানের বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো হয়।

এরপর ইউরোপের তিন দেশ পুরনো নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এই ঘটনার ১১ দিনের মধ্যে ইরানের সংসদে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিল উত্থাপিত হওয়ায় সময়ের ব্যবধানটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উদ্যোগকে আকস্মিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চাপ মোকাবিলায় একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে তিন মাসের নোটিস প্রয়োজন

এনপিটি চুক্তির ১০ নম্বর ধারায় চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, কোনো দেশ তার সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ বিপন্ন হয়েছে বলে মনে করলে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে এজন্য সদস্য দেশগুলো এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে তিন মাস আগে নোটিস দিতে হবে।

অর্থাৎ, সংসদে বিল পাস হলেও চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হবে না।

প্রতিবেদনে উত্তর কোরিয়ার উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। ২০০৩ সালে উত্তর কোরিয়া এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়া একমাত্র দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার পর দেশটি পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নেয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়ে।

ইরান এখনো পরমাণু অস্ত্র না বানানোর নীতিতে অটল?

প্রতিবেদনে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসিন রেজায়ের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি জানিয়েছেন, ইরান এখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার নীতিতে অটল রয়েছে। তবে সামরিক হুমকি অব্যাহত থাকলে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরানের বর্তমান অবস্থানের দুটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। একদিকে পরমাণু অস্ত্র না তৈরির নীতি, অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা।

কাতারের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য

প্রতিবেদনে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল থানীর বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেছেন, এমন কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, যেখানে কোনো একটি দেশ চিরকাল অনিরাপদ অবস্থায় থাকে।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রশ্নটি সামনে এসেছে।

ইরানের সামনে এখন কী পরিস্থিতি?

ইরানের সংসদে ১৩০ সদস্যের স্বাক্ষর, তিন জরুরি বিল এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কূটনৈতিক সফর, সবকিছু মিলিয়ে দেশটির বর্তমান অবস্থান নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

তবে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিল এখনো আইন হয়নি। স্পিকারের অনুমোদন, সংসদীয় প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

একই সময়ে, কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরান কি শেষ পর্যন্ত এনপিটি চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে নতুন কোনো সমাধানের পথে এগোবে, তা পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ঘটনাপ্রবাহের ওপর নির্ভর করবে।